বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬
যুক্তরাজ্যের বিচারিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব এবং চরম বিতর্কিত নজির স্থাপন করে ফিলিস্তিনপন্থি চার আন্দোলনকারীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ৪ থেকে ৮ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম—সন্ত্রাসবাদের কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা সশস্ত্র সহিংসতার প্রমাণ ছাড়াই—কেবলমাত্র সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের (Criminal Damage) দায়ে অভিযুক্ত আন্দোলনকারীদের ওপর ‘সন্ত্রাসবাদের সংশ্লিষ্টতার’ তকমা সেঁটে দেওয়া হলো। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ব্রিস্টলের কাছে অবস্থিত ইসরায়েলি মালিকানাধীন অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস ইউকে’ (Elbit Systems UK)-এর একটি কারখানায় জোরপূর্বক ঢুকে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করার দায়ে গত মাসে লিওনা কামিও, স্যামুয়েল কর্নার, ফাতেমা রাজওয়ানি এবং শার্লট হেড নামের চার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ (Palestine Action) কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল জুরি বোর্ড। তবে জুরিদের মূল শুনানিতে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসবাদের কোনো ধারা বা অভিযোগ আনা হয়নি। একই মামলায় জর্ডান ডেভলিন এবং জো রজার্স নামের অপর দুই আন্দোলনকারীকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়।
গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) লণ্ডনের আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত সাজা ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি জেরেমি জনসন (Justice Jeremy Johnson) দণ্ডপ্রাপ্তদের অপরাধের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসবাদের সংশ্লিষ্টতা’ যুক্ত করেন। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দেওয়া এক প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিচারপতি জনসন দাবি করেছিলেন—অস্ত্র সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে ইসরায়েল সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন এই আন্দোলনকারীরা, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল। তবে আইনি মারপ্যাঁচে জুরি বোর্ডের চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারকের এই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণটি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
বিচারপতি জনসন তাঁর সাজা প্রদানের রায়ে বলেন, ব্রিটিশ সেন্টেনসিং অ্যাক্টের ৬৯ ধারা অনুযায়ী তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে বিবাদীরা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কারখানায় ‘গুরুতর সম্পত্তি ভাঙচুর’ করেছেন। একই সঙ্গে তারা এলবিট সিস্টেমস ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের একাংশকে ‘ভীত-সন্ত্রস্ত’ করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য সরকারকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
বিচারকের এই বিতর্কিত ও কঠোর সিদ্ধান্তের পর ডিফেন্ডারদের মধ্যে শার্লট হেড ও লিওনা কামিওকে ৬ বছর, ফাতেমা রাজওয়ানিকে ৫ বছর ৮ মাস এবং স্যামুয়েল কর্নারকে সর্বোচ্চ ৮ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় শোনার পর আদালতের কাঠগড়ার ওপাশে থাকা পরিবারের সদস্য ও সমর্থকেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং কাচের দেয়ালে আঘাত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালত কক্ষ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় লিওনা কামিও ফিলিস্তিনি প্রখ্যাত কবি মারওয়ান মাখুলের একটি বিখ্যাত কবিতা আওড়ে উচ্চকণ্ঠে বলেন, “পাখির গান শুনতে হলে ড্রোনগুলোকে অবশ্যই শান্ত হতে হবে।”
এদিকে রায় ঘোষণার ঠিক কয়েক দিন আগে রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেওয়া একটি ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়ে আদালত কক্ষে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ওই নতুন প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, আন্দোলনকারীদের ওই বিক্ষোভের কারণে এলবিট সিস্টেমসের আইটি সিস্টেম, সামরিক সরঞ্জাম ও কারখানার অবকাঠামোসহ প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ ও যুদ্ধ সরঞ্জামও রয়েছে।
আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী রাজীব মেনন কেসি (Rajiv Menon KC) এই প্রতিবেদনের সময়জ্ঞান নিয়ে আদালতে তীব্র আপত্তি তোলেন। একে রাষ্ট্রপক্ষের ‘একেবারে শেষ মুহূর্তের নোংরা চাল’ উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঘটনা ঘটার দীর্ঘ ২০ মাস পর কেন হঠাৎ করে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো? এর ফলে আসামিপক্ষকে আইনগতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনটিকে ‘গুজব ও মনগড়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, কারখানার যেসব সুরক্ষিত অংশে আন্দোলনকারীরা প্রবেশই করেননি, সেখানকার টেকনিক্যাল ক্ষয়ক্ষতিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে।
রাজীব মেনন আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ একই মামলায় একই সাথে দুই ধরণের আইনি সুবিধা নিতে পারে না। মূল শুনানির সময় তারা আসামিদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিবাদের মানবিক উদ্দেশ্যসংক্রান্ত কোনো প্রমাণ বা গাজার পরিস্থিতি আদালতে উপস্থাপন করতে দেয়নি। অথচ এখন সাজা দেওয়ার সময় ঠিকই সেই ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ’কে টেনে এনে সাজা বহুগুণ বাড়াচ্ছেন। এটি আসামিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এই বিতর্কিত রায়কে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে শত শত ফিলিস্তিনপন্থি ও মানবাধিকার কর্মী জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা যুক্তরাজ্যের বিচারব্যবস্থাকে ‘ইসরায়েলের তাবেদার’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। যুক্তরাজ্যে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর সমর্থনে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শনের অভিযোগে লণ্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |